May 21, 2022

রোজিনা ঝড়েও অক্ষত জাহিদ মালেক, কেউ তাকে পারবে না টলাতে

রোজিনা ঝড়েও অক্ষত জাহিদ মালেক, কেউ তাকে পারবে না টলাতে,
কেউ তাকে টলাতে পারবে না। তাকে নিয়ে যতো সমালোচনা হয়, ততই তিনি শক্তিশালী হন। তার বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ যতো বেশি, তত তিনি সফল মন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এমন সমালোচনা মাথায় নিয়ে মন্ত্রীর থাকার সংখ্যা খুব কম। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এই বিরল তালিকায় নিঃসন্দেহে শীর্ষে থাকবেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জনগণকে ভালোবাসতেন। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন। জনস্বার্থ বিরোধী কাজ যেই করতেন, তার বিরুদ্ধে দ্বিধাহীনভাবে ব্যবস্থা নিতেন জাতির পিতা। এ কারণে মন্ত্রীদের সব সময় জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতেন। নানা কারণে মিজানুর রহমান চৌধুরী, শেখ আবদুল আজিজ এমনকি তাজউদ্দিন আহমেদের মতো নেতাদেরও বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রের সেই অমর বাণী বিশ্বাস করতেন ‘কেউ অপরিহার্য নয়।’

জিয়া মন্ত্রীসভাকে বানিয়েছিলেন ‘ক্রীতদাস সভা’। যতক্ষণ জিয়ার প্রশংসা করা হবে, ততক্ষণই মন্ত্রিসভায় থাকা যাবে। এরশাদ মন্ত্রিসভাকে বানিয়েছিল মিউজিক্যাল চেয়ার। এসময় জাতীয় পার্টির নেতারা সকালে পত্রিকা দেখে জানতেন, তারা মন্ত্রী আছেন কিনা। বেগম জিয়ার আমলে মন্ত্রীত্ব একটা চাকরীতে পরিণত হয়। একমাত্র সার কেলেংকারীর দায়িত্ব মাথায় নিয়ে শিল্পমন্ত্রী জহির উদ্দিন খানের পদত্যাগ ছাড়া বেগম জিয়ার মন্ত্রিসভায় কোন জবাবদিহিতা ছিলো না। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেন। শেখ হাসিনা আবার জবাবদিহিতার ধারায় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের রীতি চালু করেন। শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভা ছিলো ২৭ জনের। ঐ মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। কিন্তু মন্ত্রী হয়েও ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাওয়ায় তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেয়া হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত: মন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদের ছোট ভাই খান আফসার উদ্দিন আহমেদ। তাকেও মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৯৬ এর মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল সালাউদ্দিন ইউসুফকে। তিনি বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পরেছিলেন। (এখনকার বিতর্কের তুলনায় যা নিতান্তই শিশুতোষ) সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির জন্য সংরক্ষিত ভিভিআইপি কেবিন ব্যবহার করা নিয়ে গণমাধ্যমে তার সমালোচনা হয়। এই প্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাকে সরিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী করা হয় শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব:) রফিকুল ইসলাম ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। অর্থাৎ ৯৬ তে প্রধানমন্ত্রী মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রীদের বাদ দিতেন, নতুন মন্ত্রী নিতেন। কিন্তু ২০০৮ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হবার পর থেকে মন্ত্রিসভা রদবদলের ব্যাপারে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করেন প্রধানমন্ত্রী। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকে অভিযোগের মাথায় তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ।

একনেকের বৈঠকে অনুপস্থিতি এবং মন্ত্রণালয়ে না আসার কারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে প্রথমে দপ্তরবিহীন পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রী করা, ধর্ম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীকে বরখাস্ত করা, অজ্ঞাত কারণে বিদেশে থাকা অবস্থায় গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে স.ম. রেজাউল করিমের দপ্তর বদল ছিলো গত ১২ বছরে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার বড় পরিবর্তনগুলো। তাই পরিবর্তনের ব্যাপারে এখন শেখ হাসিনা অনেক রক্ষণশীল। কিন্তু অভিযোগ পেলে বা সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কার্পণ্য করেন না। ব্যতিক্রম শুধু জাহিদ মালেক।

এবারের মন্ত্রিসভায় প্রথমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি একজন চিকিৎসক। কিন্তু পূর্ণমন্ত্রীর আবদারে তাকে স্বাস্থ্য থেকে সরিয়ে তথ্যে দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী না থাকাও জাহিদ মালেকের সৌভাগ্য। শেখ হাসিনার আরেকটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। ২০০৯ এর মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী আ.ফ.ম রুহুল হকের সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০১ এ মোহাম্মদ নাসিমের মতো হেভিওয়েট স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও একজন ‘প্রতি’ জুড়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এবার জুড়েও তাকে সরিয়ে দেন।
ডেঙ্গু নিয়ে লেজেগোবরে। করোনা মোকাবেলায় নজীরবিহীন সমন্বয়হীনতা ব্যর্থতা। গণমাধ্যমে দুর্নীতির ডজন ডজন সংবাদ ইত্যাদি কিছুতেই নড়বড়ে হয় না স্বাস্থ্যমন্ত্রীর গদি। অদ্ভুত ম্যাজিকে তিনি আরো ক্ষমতাবান হন। দলের মন্ত্রীদের সমালোচনাও গায়ে মাখেন না জাহিদ মালেক। কারণ, তাদের চেয়ে তিনি ক্ষমতাবান। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সচিব অদলবদল হয়, ডিজির চাকরী বাড়ে। প্রধানমন্ত্রীর পর এতো ক্ষমতা আর কোন মন্ত্রীর আছে?

রোজিনা ঝড়ে আমলাতন্ত্রের মুখপাত্র হয়ে খামচিতত্ত্ব আবিস্কারের পরও অটল আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এই ঘটনা নাকি তাকে আরো ক্ষমতাবান করেছে। এবার তিনি সমালোচনাকারীদের নিশ্চয়ই এক হাত দেখে নেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.