May 21, 2022

তুরস্ক কেন কাবুল বিমানবন্দরের দায়িত্ব নিতে চায়?

আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো সৈন্যরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়া শুরু করলে সেখানে থাকা বিদেশী মিশনগুলোতে চাকরি করা বিদেশিরা, তাদের পরিবার এবং ত্রাণ সংস্থার কর্মীদের যাতায়তের নিরাপত্তার জন্য তুরস্কের কাছ থেকে কাবুল এয়ারপোর্টের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিতে চাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক জোট আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছে। ২০ বছরে দেশটিকে ক্ষত বিক্ষত করে রেখে যাচ্ছে। বিষয়টিকে তালেবান তাদের বিজয় হিসেবে দেখছে।

কিন্তু দেশটির ভবিষ্যতের জন্য এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। বিদেশী সৈন্যরা চলে যাওয়ার সাথে সাথে বাড়ছে হামলা, আক্রমণ। ভবিষ্যতে সংঘাত হয়তো আরও বাড়বে।

একদিকে আফগানিস্তানে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার, অন্যদিকে তালেবান এবং অন্য সব সশস্ত্র গ্রুপ। আগামীতে কে বসবে সরকারে। কোনও একটি গ্রুপ ক্ষমতায় আসবে? নাকি কোয়ালিশন সরকার হবে?

কার নেতৃত্বে চলবে আফগানিস্তান? সেখানে কি ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা হবে? নাকি বর্তমান বিশ্বের গতানুগতিক ধাঁচের কোনো সরকার হবে। বর্তমানে যারা সরকারি চাকরি করছেন, যারা পুলিশ এবং সেনাবাহিনীতে আছেন তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে। সেখানে, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইরান, চীন এবং ভারতের অবস্থান কী হবে? এরকম হাজারো প্রশ্নকে সামনে রেখেই ন্যাটো আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় সেখানে থাকা বিদেশীদের নিরাপত্তা, বৈদেশিক সাহায্য সহযোগিতার অবাদ বণ্টন, বিদেশি কূটনীতিবিদ এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং পশ্চিমাদের অন্য সব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর নিরাপত্তার জন্য তুরস্কের শরণাপন্ন হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

কোন সমুদ্রসীমা এবং সমুদ্র বন্দর না থাকা এই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটির বহির্বিশ্বের সাথে সহজ যোগাযোগের একমাত্র পথ কাবুল এয়ারপোর্ট। তুরস্ককে এই কাবুল বিমান বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তুরস্ক বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে। কিন্তু তার মানে এ নয় যে তুরস্ক এই এয়ারপোর্টের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে।

তুরস্ক এক্ষেত্রে বড় কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে আমেরিকা এবং ন্যাটো জোটকে।

এক নম্বর শর্তঃ এই দায়িত্বের বিনিময়ে তুরস্ককে লজিস্টিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিতে হবে। অর্থাৎ তুরস্ক বর্তমানে যে অর্থনৈতিক, এবং আন্তর্জাতিক সামস্যায় আছে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে দেখছে এই গুরু দায়িত্বটিকে!

দুই নম্বর শর্তঃ তুরস্ক এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এবং ন্যাটো সদস্য হাঙ্গেরিকে সাথে নিবে। আর ন্যাটোর তা মেনে নিতে হবে।

এছাড়াও আছে কিছু অলিখিত বা গোপন শর্ত – যেমন তুরস্কের এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার জন্য আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিতে হবে। তুরস্ককে এফ৩৫ যুদ্ধ বিমান প্রজেক্টে আবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে তুরস্কের আরও যে সব স্বার্থ আছে সেগুলো কিছুটা এরকম

১। ন্যাটো তথা আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভালো করা। দু’দেশের মধ্যে যে ঝামেলাগুলো চলছে সেগুলো সমাধানে নতুন কোনও সম্ভাবনার দ্বার উম্মচন চাচ্ছে তুরস্ক।এতে ন্যাটোর মধ্যে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করার ইচ্ছা পোষণ করছে তুরস্ক।

আঙ্কারা জানে যে, চীনের দ্রুত প্রসার ঢেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন মরিয়া। ন্যাটো চীনের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। চীনের রোড এন্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভের বিরুদ্ধে সব ফ্রন্টে লড়তে চায় পশ্চিমা জোট। আফগানিস্তান রোড এন্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভে না থাকলেও চীনের সাথে বর্ডার আছে দেশটির। ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে দেশটি। তাই চীনকে ঠেকানোর অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে তুরস্কের উপস্থিতি ন্যাটোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর তুরস্ক চায় এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে।

২। অন্যদিকে তুরস্কের নিজস্ব কিছু কৌশলগত স্বার্থ আছে আফগানিস্তানে। তুরস্ক যদি ওখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে পারে তাহলে হয়ত ভবিষ্যতে সামরিক ঘাঁটিও গড়তে পারে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গভীর করার যে পরিকল্পনা নিয়েছে তুরস্ক, আফগানিস্তানে তুর্কি সেনাদের উপস্থিতি বা একটি সামরিক ঘাঁটি সে পরিকল্পনাকে আরও মজবুত করবে।

৩। আর আফগানিস্তানে তুরস্কের, বিনিয়োগ, ব্যবসা, সাহায্য সহযোগিতার বিষয়গুলো তো আছেই।

কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তুরস্ক, তালেবানের সাথে যুদ্ধ জড়াবে কি না? কারণ তালেবান এই পরকিল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তালেবান মুখপাত্র স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, যে কোনও অজুহাতেই হোক না কেন, কোনো দেশের সৈন্য আফগানিস্তানে থাকলে তাদের ওপেন টার্গেটে পরিণত হবে। আর তুরস্ক যেহেতু ন্যাটোর অংশ হিসেবে আছে তাই তুরস্কের আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে হবে। এখণ তুরস্ক কিভাবে তালেবানের এই থ্রেটকে মোকাবেলা করবে?

এর সহজ উত্তর হচ্ছে, তুরস্ক তালেবানের সাথে অতীতেও যুদ্ধে জড়ায় নি আর ভবিষ্যতেও জড়াবে না।

তুরস্ক কিন্তু সেই ২০০১ সাল থেকেই আফগানিস্তানে আছে। ন্যাটোর অংশ হিসেবে প্রায় ৫০০ তুর্কি সেনা এখনো আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করছে। তুরস্কের সৈন্যরা গত দুই দশক বছর ধরে কাবুলে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তবে এক্ষেত্রে তুরস্কের মূল নীতি ছিলো, তার সেনারা সরাসরি কোনও যুদ্ধে অংশ নিবে না। তুরস্কের সেনাবাহিনী সেখানে, রাস্তা তৈরি করেছে, কালভারট তৈরি করছে, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল মেরামত করছে, আফগানিস্তানের পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অর্থাৎ ন্যাটোর সদস্য হওয়ার পরেও তুরস্ক কোনো যুদ্ধ মিশন নিয়ে আফগানিস্তানে ছিলো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.